ক্লাব তো নয় যেন অপরাধের গোলা

এক সময় খেলাধুলায় নৈপুণ্যের জন্য রাজধানীর মতিঝিল ক্লাবপাড়ার বেশ সুনাম ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সুস্থধারার খেলাধুলার পরিবর্তে এসব ক্লাবে নিষিদ্ধ ক্যাসিনো সাজিয়ে জুয়া খেলাসহ নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকা- চলছে। এভাবে দিনের পর দিন এক একটি ক্লাব যেন অপরাধের এক একটি গোলায় পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালীদের হাতে নিয়ন্ত্রিত ক্লাবগুলোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যাতায়াত আর অবৈধ লেনদেনের কারণে অনেকদিন ধরেই অবাধে চলেছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। সরকার বদল হলে বদলে যায় ক্লাবগুলোর নিয়ন্ত্রকও।রাজধানীর শ্যামলী সিনেমা হলের পেছনে রিংরোড শ্যামলী মাঠের এক কোণে স্থাপন করা হয়েছে শ্যামলী ক্লাব। খেলাধুলার পরিবর্তে কয়েক মাস পরপর মাঠে মেলার নামে অর্থ আদায় আর ক্লাবঘরে জুয়ার আসর চলছে এখানে। স্থানীয়রা বলছেন, ক্লাব চালান আদাবর থানা যুবলীগের আহ্বায়ক আরিফুর রহমান তুহিন। তিনি শ্যামলী ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকও। ওই ক্লাবকে কেন্দ্র করে আগারগাঁওয়ের এলজিইডি ভবন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ঢাকা জোনের টেন্ডারবাজির নিয়ন্ত্রণ তুহিনের হাতে।পছন্দের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কমিশনে কাজ পাইয়ে দিতে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ১৫টি ফার্মের শত কোটি টাকার টেন্ডারের কাগজপত্র ছিনতাই করে তুহিন বাহিনীর সদস্যরা। নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে পছন্দের ফার্মকে টেন্ডার পাইয়ে দেয় তুহিন ও ছোট সোহাগের ক্যাডাররা। গত বছরের নভেম্বরে যুবলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে গাড়ি চাপা পড়ে আদাবরে দুই কিশোর নিহত হয়। ওই ঘটনায় তুহিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।খিলগাঁও সি-ব্লক কলোনি মসজিদ সংলগ্ন সরকারি কোয়ার্টারের দোতলা দখল করে ‘রবি সোসাইটি ক্লাব’ গঠন করেন শাহাদাত হোসেন সাধু। অনিবন্ধিত ওই ক্লাবে ৩৬টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে চলত ইয়াবা বার। অভিযোগ পেয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে ক্লাব থেকে ৩৪ জনকে আটক করে। এর পর গ্রেপ্তার এড়াতে দেশ ছাড়েন এক সময় পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করা ‘ফর্মা সাধু’। গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সেকেন্ড ইন কমান্ড তিনি।সংশ্লিষ্টরা বলছে, সাধু ছিলেন খালেদের অস্ত্রভাণ্ডা। নূরে মক্কা ও বাহন পরিবহনে চাঁদাবাজি, ইয়াবার কারবার, ফুটপাতে অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।রাজধানীর রমনার সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের কক্ষ ও মাঠের জায়গা দখলের পর ক্লাব করে মাদক ব্যবসা চালান যুবলীগ নেতা গোলাম মোস্তফা শিমুল, দেওয়ান আলীম উদ্দিন শিশির ও মাসুদ রানা। সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে নিরাপত্তা বলয় তৈরির মাধ্যমে কলেজ মাঠে ইয়াবা কারবার করেন তারা। পরে স্থানীয় কাউন্সিলর মুন্সি কামরুজ্জামান কাজল ক্লাবটি উচ্ছেদ করেন।শিমুল এক সময় বিএনপির আরিফ কমিশনারের ক্যাডার হলেও ক্ষমতার পালাবদলে এখন পদবিহীন ‘যুবলীগ নেতা’। এ ছাড়া মৌচাকের আনারকলি মার্কেট, বিদ্যালয়ের মাঠ ও স্থানীয় মসজিদের আশপাশে কয়েকশ ছোট-বড় দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে।গত বৃহস্পতিবার র‌্যাবের অভিযানের আগ পর্যন্ত মতিঝিল-দিলকুশা-আরামবাগের ক্লাবপাড়া নিয়ন্ত্রণ করতেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর একেএম মমিনুল হক সাঈদ। যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁঁইয়া, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা কাওসারসহ কয়েকজন মালিকানা থাকলেও সাঈদ বাহিনী ছিল সবকটি ক্লাবের পাহারাদার।তবে চাঁদাবাজির বিষয়টি অস্বীকার করে মমিনুল হক সাঈদ আমাদের সময়কে বলেন, আরামবাগ ও দিলকুশা ক্লাব আমার নামে চলত। সেখানে লোকজন ক্যাসিনো-জুয়ার আসর বসাত কিনা বিষয়টি আমার জানা নেই।মোহাম্মদপুর তিন রাস্তা বেড়িবাঁধে যুবলীগের ক্লাব বসিয়ে মতিঝিল, চিটাগাং রোড, উত্তরা আব্দুল্লাহপুর, ডেমরা রুটে চলাচলকারী বাসে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। এ ক্লাবের নিয়ন্ত্রক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব। তিনি আগে মোহাম্মদপুর টাউন হল শহীদ পার্কে মোহাম্মদপুর ক্লাব গঠন করে বিএনপির লোকজন দিয়ে চাঁদাবাজি করতেন।ফাঁকা মতিঝিলের ক্লাবপাড়াএদিকে র‌্যাব-পুলিশের অভিযানের পর মতিঝিল-আরামবাগ-দিলকুশার ক্লাবপাড়া ফাঁকা। অভিযানের আওতায় পড়া সবকটি ক্লাব নামক জুয়া-ক্যাসিনোর আসর সিলগালা করা হয়েছে। নেই জুয়াড়িদের আনাগোনাও। অভিযানের আগে রাতে ক্লাবপাড়া ছিল আলো ঝলমলে পরিবেশ। সন্ধ্যার পরই ক্লাবপাড়া থাকত মানুষে ঠাসা। আর এখন ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে।অভিযানের বাইরে রয়েছে মেরিনার্স ক্লাব। এটির বাইরে আগের মতো নিরাপত্তা কর্মীর উপস্থিতি থাকলেও ভেতরে-বাইরে মানুষের যাতায়াত দেখা যায়নি। ওই ক্লাবে কী হতো এ নিয়ে কেউ কিছু বলতে রাজি হয়নি। একই অবস্থা মতিঝিলের ওয়ারী ক্লাবেও।আরামবাগের সিগারেট বিক্রেতা মফিজুর রহমান জানান, কদিন আগেও ক্লাবপাড়ায় দিনরাত মানুষের ভিড় লেগেই ছিল। ব্যাংকপাড়া বন্ধের পর রাত যত গভীর হতো ততই বাড়ত মানুষের আনাগোনা। ব্যাংক-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তাসহ রাজনীতিবিদ এমনকি বিভিন্ন জেলা থেকে আসত জুয়াড়িরা। প্রতিটি ক্লাবে ছিল ডিলার নামক জুয়াড়িদের নিয়মিত দাওয়াত দেওয়ার কর্মচারী। কোনো জুয়াড়ি ক্লাবে অনিয়মিত হলেই তাদের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে বিশেষ অফার দিতেন এই ডিলাররা। আবার নারী ডিলারদের দিয়ে বিশেষ লোভও দেখানো হতো ক্লাবের জুয়া-ক্যাসিনোর আসরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares