শুদ্ধি অভিযানে কি শুদ্ধ হবে

ক্যাসিনো-জুয়ার আসর, চাঁদাবাজ ও শীর্ষ টেন্ডারবাজদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অবৈধভাবে ক্যাসিনো বসানো যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার পর শীর্ষ টেন্ডারবাজ জিকে শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও গ্রেপ্তার হয়েছেন কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ। গতকাল শনিবার ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় অভিযান চালানো হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। এর আগে ছাত্রলীগের শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল এনে অনিয়মকারীদের হুশিয়ারি দেন তিনি।এদিকে অভিযান শুরুর পর গ্রেপ্তার এড়াতে এসব চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজের গডফাদারদের অনেকে পর্দার আড়ালে চলে গেছেন।আতঙ্কে আছেন চুনোপুঁটিরাও। আওয়ামী লীগের যারা দুর্নীতিতে জড়িত, তারাও ছাড় পাবেন না বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে এই শুদ্ধি অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের সুশীল সমাজ। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনে এসব অবৈধ ক্যাসিনো চললেও তা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন সরকারের হাইকমান্ডের সদিচ্ছায় যে অভিযান শুরু হয়েছে তার সুফল অবশ্যই আসবে। তবে বিরোধী পক্ষের অনেকেই এর সফলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ক্ষমতাসীন দলের বড় বড় নেতার বাসায় অভিযান চালালে দুর্নীতির থলের কালো বিড়াল বেরিয়ে আসবে।সমাজচিন্তকরা বলছেন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বা দুর্নীতি যেখানে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকেছে, সেখান থেকে এক দিনেই বেরিয়ে আসা যাবে না। তবে সময়োপযোগী এ উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি ছিল। একজন অপরাধীর দল-মতের পরিচয় না দেখে অভিযান অব্যাহত রাখলে সুদিন আসবেই।সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন আমাদের সময়কে বলেন, যারা শুদ্ধি অভিযান করছে তারা কতটা শুদ্ধ? একমাত্র প্রধানমন্ত্রী সৎ হলে তো হবে না। তার দলীয় ও আশপাশের লোকজন, দলের তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে কতটা দলীয় আদর্শ আছে? তারা কতটা দখল, দুর্নীতি করছেÑ এটা ধরে ধরে ব্যবস্থা নিতে হবে।সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ উপদেষ্টা বলেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগের এমন দু-একজনকে বহিষ্কার করলেই দেশ শুদ্ধ হবে না। সারাদেশে ছাত্রলীগ-যুবলীগের এমন বহু নেতাকর্মী রয়েছেন। যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাঁদাবাজি করছেন, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সন্ত্রাস করছেনÑ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলে সুফল আসবে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ স ম আরেফিন সিদ্দিক বলেন, শুদ্ধি অভিযানে কতটা শুদ্ধ হতে পারব এটা বলা মুশকিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে অভিযান শুরু করেছে, যেভাবে অপরাধীদের অবৈধ আস্তানায় হানা দিচ্ছে- এটি ইতিবাচক। তবে সমাজে শুদ্ধি আনতে হলে সবার আগে আত্মশুদ্ধি দরকার। সরকার এখন অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু কিছুদিন পর ছেড়ে দিলে আবারও শুরু হবে। এ জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির ব্যবস্থা করতে। এতে অল্পবয়স থেকে আত্মশুদ্ধি সৃষ্টি হবে।বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে ইয়াবা চোরাচালানের প্রধান রুট কক্সবাজারের মাদককারবারিদের আত্মসমর্পণসহ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে চলছে। কিন্তু ইয়াবা বিক্রি বন্ধ হচ্ছে না। অনেকে মনে করেন, কারবারির মূল হোতা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় ইয়াবার চালান আসা বন্ধ হচ্ছে না। ক’দিন পর ইয়াবার মতো দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মদ, জুয়ার আসর বসানো প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধেও হয়তো অভিযান থেমে গেলে আবারও তারা পুরনো রূপে ফিরে আসবেন। এ জন্য অভিযান অব্যাহত রেখে টেকসই সমাধান চান সংশ্লিষ্টরা।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নেহাল করিম মনে করেন, চলমান অভিযান কিছুটা আইওয়াশ। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কক্সবাজারের ইয়াবা কারবারিদের মূল হোতারা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, দুর্নীতি-অপরাধের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখের সামনে অবৈধ কার্যকলাপ চলছিল। এগুলো বন্ধ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একটা কাজ শুরু হলো। এখন কে কোন দলের, কোন পক্ষেরÑ এগুলো বিচার না করে কারা আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন।দেশে সুশাসন আনার জন্য এ ঘোষণা ও তার প্রতিফলন অনেক আগেই দরকার ছিল। তবে যখন একবার শুরুই হয়েছে, এটা অব্যাহত রাখতে হবে। শুধু খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া নয়, তাদের পেছনে থেকে কারা ইন্ধন দিতেন, খালেদ-জিকে শামীমের অবৈধ টাকা কার কার পকেটে গেছেÑ এসব ব্যক্তিকেও ধরতে হবে।দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান ড. গোলাম রহমান বলেন, আমাদের যে নৈতিক অবক্ষয়, এটা এক দিনে হয়নি। তাই এটা এক দিনেই ঠিক হয়ে যাবেÑ এটাও প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। একটা-দুইটা অ্যাকশনে সব শেষ হয়ে যাবে না। দুর্নীতি-অপরাধের বিরুদ্ধে যে একটা অপারেশন শুরু হয়েছে, এটা শুভসূচনা বলতেই হয়। এ কার্যক্রম পরিচালনাসহ মানুষের মধ্যে নৈতিক পরিবর্তন এলেই দেশ শুদ্ধ হবে।ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, দেশে আর্থিক সন্ত্রাস বৃদ্ধি পাওয়ায় কালো টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কালোচক্রের ফলে নতুন উদ্যোক্তা কম হচ্ছে। আমরা এ ধরনের শুদ্ধি অভিযানকে সব সময়ই সাধুবাদ জানাই।তিনি আরও বলেন, ক্যাসিনো ও অন্যান্য মাধ্যমে টাকা পাচার হয়ে থাকে। যার ফলে দেশের বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলে। দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ রাখতে এ ধরনের অবৈধ পথে টাকা উপার্জনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares